প্রদোষে প্রদ্যোত
যে-যুগে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গেছে, অধ্যাপনার সঙ্গে পান্ডিত্যের যোগাযোগ বলতে গেলে লুপ্ত, সেই সংকটকালে এখনো যে-স্বল্পসংখ্যক শ্রদ্ধাভাজন মনীষী প্রায়-অন্ধকার শিক্ষাঙ্গনে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো অকাতরে আলোক বিতরণ করছেন তাঁদের একজন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আমি তাঁর একেবারে পেছনের কাতারের একজন ছাত্র। তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁকে আমি যেমনটা দেখেছি, সেটা বলা হয়ত অসম্ভব নয়।
আত্মবিশ্বাসের অভাব আর মিশতে পারার অক্ষমতা—এই দুই কারণে সবার পেছনে আমি লুকিয়ে থেকেছি চিরদিন। এতে আমার আগাগোড়াই ক্ষতি হয়েছে, তবে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে ছাত্রজীবনে। শিক্ষকদের কাছাকাছি যেতে পারি নি। যে-সাহায্য এবং শিক্ষা তাঁদের কাছ থেকে পাওয়ার সুযোগ এসেছিল, তার সদ্ব্যবহার করতে পারি নি পুরোপুরি। উল্টো প্রথম দিনেই শরীফ স্যারের ধমকে নিজের খোলসের মধ্যে আরও সেঁদিয়ে গিয়েছিলাম। সেই খোলস থেকে আমাকে খানিকটা টেনে বের করেছিলেন মুনীর স্যার আর আনিস স্যার। কিন্তু এঁদের দুজনের মধ্যে মস্ত একটা পার্থক্য ছিল। মুনীর স্যারের থেকে আকর্ষণীয় করে পড়াতে আমি কাউকে দেখিনি। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা গিলতাম। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল নিতান্তই নৈর্ব্যত্তিক। যতদিন ছাত্র ছিলাম ক্লাসের বাইরে তাঁর সঙ্গে কোনোদিন কথা হয় নি। শ্রেণীকক্ষের বাইরে বিভাগের একমাত্র শিক্ষক যাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তিনি আনিস স্যার। তিনি সেই অল্প বয়সেই ভালো ছাত্র এবং গবেষক হিসেবে প্রায় জীবিত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু মুনীর স্যারের মতো তিনি ধরা-ছোঁয়ার একেবারে বাইরে ছিলেন না।
প্রতিভাবান লোকেরা বেশির ভাগই উৎকেন্দ্রিক হন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান খুবই প্রতিভাবান, কিন্তু, আশ্চর্য, তিনি আর-পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো-স্বাভাবিক। তাঁর মতো এমন নিরহঙ্কার, নিজেকে জাহির না করা, বিনয়ী, মৃদুভাষী, ভদ্রলোক খুবই কম দেখেছি আমি। তাঁর পান্ডিত্য আছে, কিন্তু পাণ্ডিত্যের সঙ্গে যুক্ত অসহিষ্ণুতা অথবা রুক্ষতা নেই। তাঁর পান্ডিত্য সম্পর্কে আর-একটা কথা না-বলে পারিনে। বিশেষজ্ঞতার এই যুগে পাণ্ডিত্য ধারালো হয়, কিন্তু তা সীমাবদ্ধ থাকে সংকীর্ণ এলাকার মধ্যে। অধ্যাপক আনিসুজ্জমানের পাণ্ডিত্য সে রকম নয়। তিনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে ব্যাপক অধ্যয়ন করেছেন। একটি বেতারের জন্যে আমি অনেক বার তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছি, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে। প্রতিবারেই লক্ষ করেছি, তিনি তথ্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। সেইসঙ্গে দিয়েছেন নিজের মৌলিক পর্যবেক্ষণ।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গবেষণা শুরু করেছিলেন বাংলা সাহিত্যে মুসলিম অবদান নিয়ে। এই প্রসঙ্গে তিনি মুসলিম মানসের যে-ঐতিহাসিক পটভূমি অঙ্কন করেন এবং তার ব্যাখা দেন, তা তখনো পর্যন্ত ছিল এ বিষয়ে সবচেয়ে মূল্যবান গবেষণা। ছাত্রজীবনে তাঁর এই গবেষণার মূল্য বুঝতে পারি নি। কিন্তু পরে খানিকটা পেরেছিলাম। তাঁর অভিসন্দর্ভরচনা করতে গিয়ে তিনি যেসব মুসলিম-পরিচালিত পত্রপত্রিকা ব্যবহার করেছিলেন, তার অনেকগুলোর নামও অনেকের জানা ছিল না। সেগুলো ব্যবহার করা তো দূরের কথা। পরে এই পত্রপত্রিকার পরিচয় দিয়ে তিনি যে-গ্রন্থটি রচনা করেন, সেটি খুবই মূল্যবান হয়েছিল অন্য গবেষকদের জন্যে। আরও একটি অত্যন্ত মূল্যবান গবেষণা তিনি পরে লন্ডনে করেছিলেন, বাংলা গদ্য নিয়ে। এক সময়ে বাংলা গদ্যের ইতিহাস লেখা হত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে। কিন্তু যাঁদের গবেষণার ফলে এখন সে ইতিহাস শুরু হয় আরো আগে থেকে, তিনি তাঁদের অগ্রণী। ১৭৯০-এর দশকে তাঁতীদের লেখা চিঠি থেকে তিনি প্রাক-ফোর্ট উইলিয়াম কলেজী গদ্যের সন্ধান দেন। এই গদ্যের চেহারা এবং চরিত্র, পন্ডিতী গদ্য থেকে আলাদা। এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তিনি যে-গ্রন্থটি রচনা করেন, সেটি আকারে ছোটো কিন্তু বাংলা গদ্য সম্পর্কিত গবেষণার দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পান্ডিত্য সম্পর্কে বিস্ময়ের সঙ্গে যা লক্ষ করি, তা হল: তিনি বেশির ভাগ পন্ডিতের মতো সংক্ষিপ্ত পথে বিশ্বাস করেন না। বরং প্রতিটি বিষয়ের গভীরে যেতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments